চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণ কেন হয়? সহজ ভাষায় পূর্ণ ব্যাখ্যা

চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণ কেন হয়

প্রকৃতির সবচেয়ে মজাদার ও রহস্যময় ঘটনাগুলোর মধ্যে গ্রহণ অন্যতম। রাতের আকাশে চাঁদ ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া বা দিনের বেলায় সূর্যকে ঢেকে দেওয়ার মতো দৃশ্য আমাদের মুগ্ধ করে। কিন্তু চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণ কেন হয়? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে আমাদের বুঝতে হবে পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্যের মধ্যে জ্যামিতিক সম্পর্ক। এই ব্লগ পোস্টে আমরা সহজ ভাষায় গ্রহণ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।


গ্রহণ কী?

গ্রহণ হলো একটি মহাজাগতিক ঘটনা, যখন একটি মহাকাশীয় বস্তু অন্য একটি বস্তুর ছায়ায় ঢেকে যায়। মূলত দুই ধরনের গ্রহণ আমরা দেখতে পাই:

  •  চন্দ্রগ্রহণ (Lunar Eclipse) – যখন পৃথিবীর ছায়া চাঁদের উপর পড়ে।
  •  সূর্যগ্রহণ (Solar Eclipse) – যখন চাঁদের ছায়া পৃথিবীর উপর পড়ে।

এখন আসুন, বিস্তারিতভাবে জেনে নিই এই গ্রহণগুলো কীভাবে ঘটে।


চন্দ্রগ্রহণ কেন হয়?

চন্দ্রগ্রহণ তখনই হয় যখন পৃথিবী সূর্য ও চাঁদের মাঝখানে আসে এবং পৃথিবীর ছায়া চাঁদের উপর পড়ে। এটি সাধারণত পূর্ণিমার রাতে ঘটে।

চন্দ্রগ্রহণের প্রক্রিয়া

  •  সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদ এক সরলরেখায় অবস্থান করে – পৃথিবী সূর্য ও চাঁদের মাঝে থাকে।
  •  পৃথিবীর ছায়া দুটি অংশে বিভক্ত –
  •  উপচ্ছায়া (Penumbra) – হালকা ছায়া, যেখানে সূর্যের কিছু আলো পৌঁছায়।
  •  গভীর ছায়া (Umbra) – অন্ধকারাচ্ছন্ন অংশ, যেখানে সূর্যের আলো একেবারেই পৌঁছায় না।
  •  চাঁদ যখন পৃথিবীর গভীর ছায়ায় প্রবেশ করে, তখন পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ হয়।

চন্দ্রগ্রহণের প্রকারভেদ

  •  পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ (Total Lunar Eclipse) – চাঁদ সম্পূর্ণরূপে পৃথিবীর গভীর ছায়ায় ঢাকা পড়ে।
  •  আংশিক চন্দ্রগ্রহণ (Partial Lunar Eclipse) – চাঁদের কিছু অংশ গভীর ছায়ায় ঢাকা পড়ে।
  •  উপচ্ছায়া চন্দ্রগ্রহণ (Penumbral Lunar Eclipse) – চাঁদ শুধুমাত্র উপচ্ছায়ায় ঢাকা পড়ে, তাই এটি সহজে চোখে পড়ে না।

চন্দ্রগ্রহণ কতক্ষণ স্থায়ী হয়?

একটি পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ সাধারণত কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হতে পারে, তবে চাঁদ সম্পূর্ণ গভীর ছায়ায় থাকে প্রায় ১ ঘণ্টা।

সূর্যগ্রহণ কেন হয়?

সূর্যগ্রহণ হয় যখন চাঁদ পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে চলে আসে এবং চাঁদের ছায়া পৃথিবীর উপর পড়ে। এটি শুধুমাত্র অমাবস্যার দিনে ঘটে।

সূর্যগ্রহণের প্রক্রিয়া

  •  চাঁদ, পৃথিবী ও সূর্য এক সরলরেখায় অবস্থান করে – চাঁদ সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে আসে।
  •  চাঁদের ছায়া পৃথিবীর উপর পড়ে – এই ছায়া দুটি অংশে বিভক্ত:
  •  গভীর ছায়া (Umbra) – যেখানে সূর্য সম্পূর্ণ ঢাকা পড়ে (পূর্ণ সূর্যগ্রহণ)।
  •  উপচ্ছায়া (Penumbra) – যেখানে সূর্য আংশিক ঢাকা পড়ে (আংশিক সূর্যগ্রহণ)।

সূর্যগ্রহণের প্রকারভেদ

  •  পূর্ণ সূর্যগ্রহণ (Total Solar Eclipse) – চাঁদ সম্পূর্ণরূপে সূর্যকে ঢেকে ফেলে, শুধুমাত্র করোনা দৃশ্যমান হয়।
  •  আংশিক সূর্যগ্রহণ (Partial Solar Eclipse) – চাঁদ সূর্যের কিছু অংশ ঢেকে রাখে।
  •  বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ (Annular Solar Eclipse) – চাঁদ সূর্যকে সম্পূর্ণ ঢাকতে পারে না, ফলে একটি আলোর বলয় দেখা যায়।
  •  সংকর সূর্যগ্রহণ (Hybrid Solar Eclipse) – কিছু স্থানে পূর্ণ এবং কিছু স্থানে বলয়গ্রাস গ্রহণ দেখা যায়।
  • সূর্যগ্রহণ কতক্ষণ স্থায়ী হয়?

পূর্ণ সূর্যগ্রহণ সর্বোচ্চ ৭ মিনিট ৩১ সেকেন্ড পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে, তবে সাধারণত এটি ২-৩ মিনিট পর্যন্ত দেখা যায়।

চন্দ্রগ্রহণ সূর্যগ্রহণের মধ্যে পার্থক্য

বৈশিষ্ট্য

চন্দ্রগ্রহণ

সূর্যগ্রহণ

ঘটার সময়

পূর্ণিমার রাতে

অমাবস্যার দিনে

কারণ

পৃথিবীর ছায়া চাঁদে পড়ে

চাঁদের ছায়া পৃথিবীতে পড়ে

দৃশ্যমানতা

পৃথিবীর রাতের অংশ থেকে দেখা যায়

খুব সংকীর্ণ এলাকা থেকে দেখা যায়

স্থায়িত্ব

কয়েক ঘণ্টা

কয়েক মিনিট

দেখার নিরাপদ উপায়

খালি চোখে দেখা যায়

বিশেষ চশমা বা ফিল্টার প্রয়োজন



গ্রহণ দেখার সঠিক নিয়ম ও সতর্কতা

চন্দ্রগ্রহণ দেখার নিয়ম

চন্দ্রগ্রহণ খালি চোখে দেখা সম্পূর্ণ নিরাপদ।
টেলিস্কোপ বা বাইনোকুলার ব্যবহার করলে আরও ভালোভাবে দেখা যায়।

সূর্যগ্রহণ দেখার নিয়ম
কখনই খালি চোখে সূর্যগ্রহণ দেখা নিরাপদ নয় – এটি চোখের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।
বিশেষ সোলার ফিল্টার বা গ্রহণ চশমা ব্যবহার করুন।
পিনহোল প্রজেক্টরের মাধ্যমেও নিরাপদে দেখা যায়।


গ্রহণ সম্পর্কে কিছু মজার তথ্য

  •  "ব্লাড মুন" – পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদ লালচে দেখায়, কারণ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল দ্বারা সূর্যের লাল আলো প্রতিসরিত হয়।
  •  সূর্যগ্রহণ খুবই বিরল – যদিও বছরে ২-৫টি সূর্যগ্রহণ হয়, তবে একটি নির্দিষ্ট স্থান থেকে দেখা যায় প্রতি ৩৬০ বছরে একবার!
  •  গ্রহণের সময় প্রাণীর আচরণ – অনেক প্রাণী গ্রহণের সময় বিভ্রান্ত হয়, পাখিরা ঘুমাতে যায় বা বাদুড় বেরিয়ে আসে!

প্রশ্ন উত্তর


১. চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণ বছরে কতবার হয়?

উত্তর:
চন্দ্রগ্রহণ: বছরে সাধারণত ২ থেকে ৫টি চন্দ্রগ্রহণ হয়।

সূর্যগ্রহণ: বছরে ২ থেকে ৫টি সূর্যগ্রহণ হতে পারে, তবে একটি নির্দিষ্ট স্থান থেকে

 দেখা যায় প্রতি কয়েকশ বছর পর।

২. চন্দ্রগ্রহণ শুধু রাতেই হয় কেন?

উত্তর: চন্দ্রগ্রহণ শুধুমাত্র পূর্ণিমার রাতে হয়, কারণ তখনই চাঁদ ও সূর্য পৃথিবীর বিপরীত

 দিকে থাকে এবং পৃথিবীর ছায়া চাঁদের উপর পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

৩. সূর্যগ্রহণ দেখার সময় চোখের ক্ষতি হয় কেন?

উত্তর: সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি সরাসরি চোখে পড়লে রেটিনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা

 স্থায়ী অন্ধত্বও ডেকে আনতে পারে। তাই বিশেষ সোলার ফিল্টার ছাড়া সূর্যগ্রহণ দেখা

 বিপজ্জনক।


৪. চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদ লাল দেখায় কেন?

উত্তর: পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল সূর্যের নীল আলো ছেঁকে দেয় এবং লাল আলো প্রতিসরিত করে

 চাঁদের দিকে পাঠায়। এই কারণে চাঁদ রক্তবর্ণ বা কমলা দেখায়, একে "ব্লাড মুন" বলে।

৫. বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ কেন হয়?

উত্তর: যখন চাঁদ পৃথিবী থেকে তুলনামূলক দূরে থাকে (অপসূর অবস্থানে), তখন এটি

 সূর্যকে সম্পূর্ণ ঢাকতে পারে না। ফলে সূর্যের চারপাশে একটি আলোর বলয় দেখা যায়,

 যাকে annular eclipse বলে। 

৭. গ্রহণের সময় গর্ভবতী মহিলাদের সতর্কতা কেন?

উত্তর: কিছু সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করা হয় যে গ্রহণের সময় ক্ষতিকর রশ্মি নির্গত হয়, যা

 গর্ভস্থ শিশুর ক্ষতি করতে পারে। তবে বৈজ্ঞানিকভাবে এটির কোনো ভিত্তি নেই।

শেষ কথা

গ্রহণ প্রকৃতির একটি অদ্ভুত সুন্দর ঘটনা। চন্দ্রগ্রহণ সূর্যগ্রহণ কেন হয় তা জানার পর এই মহাজাগতিক ঘটনা সম্পর্কে আমাদের কৌতূহল আরও বেড়ে যায়। পরেরবার যখন গ্রহণ হবে, আপনি নিরাপদে এটি উপভোগ করতে পারবেন এবং অন্যদেরও জানাতে পারবেন।

আরও পড়ুনঃ 




Next Post Previous Post