কম্পিউটার ভাইরাস: কী, কত প্রকার ও লক্ষণসহ প্রতিরোধের উপায়

কম্পিউটার ভাইরাস কী, কত প্রকার ও লক্ষণসহ প্রতিরোধের উপায়

ভূমিকা: ডিজিটাল যুগের নীরব শত্রু

আধুনিক জীবনে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট ছাড়া একটি দিনও কল্পনা করা কঠিন। কিন্তু এই ডিজিটাল সুবিধার পাশাপাশি বেড়েছে সাইবার হুমকি, যার মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত হলো কম্পিউটার ভাইরাস। 

হঠাৎ কম্পিউটার ধীরগতি হওয়া, অচেনা পপ-আপ বার্তা, কিংবা গুরুত্বপূর্ণ ফাইল হারিয়ে যাওয়া—এসব সমস্যার পেছনে প্রায়ই দায়ী এই ভাইরাস। কিন্তু ভাইরাস আসলে কী? এটি কীভাবে কাজ করে? এর প্রকারভেদ ও প্রতিরোধের উপায়ই বা কী? এই ব্লগে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব।


কম্পিউটার ভাইরাস কী?

কম্পিউটার ভাইরাস হলো এক ধরনের ক্ষতিকর সফটওয়্যার (ম্যালওয়্যার), যা ব্যবহারকারীর অনুমতি ছাড়াই সিস্টেমে প্রবেশ করে এবং নিজেকে অন্যান্য প্রোগ্রাম বা ফাইলের সাথে যুক্ত করে। এটি ডেটা ধ্বংস, তথ্য চুরি, বা সিস্টেমের কার্যক্ষমতা ব্যাহত করতে পারে।        

জৈবিক ভাইরাসের মতোই এটি এক হোস্ট থেকে অন্য হোস্টে ছড়ায়, সাধারণত ইমেইল অ্যাটাচমেন্ট, ইনফেক্টেড সফটওয়্যার, বা রিমোভেবল ড্রাইভের মাধ্যমে।

কম্পিউটার ভাইরাসের প্রকারভেদ

ভাইরাসের কাজের পদ্ধতি ও লক্ষ্য অনুযায়ী এদের বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। নিচে ১০টি প্রধান প্রকার উল্লেখ করা হলো:

১. ফাইল ইনফেক্টর ভাইরাস

এই ভাইরাস এক্সিকিউটেবল ফাইল (.exe, .com) সংক্রমিত করে। ব্যবহারকারী প্রোগ্রাম চালালে ভাইরাস সক্রিয় হয় এবং অন্যান্য ফাইলে ছড়িয়ে পড়ে। উদাহরণ: CIH ভাইরাস

 ২. বুট সেক্টর ভাইরাস

এটি স্টোরেজ ডিভাইসের বুট সেক্টরকে টার্গেট করে, যা অপারেটিং সিস্টেম লোড হওয়ার আগেই সক্রিয় হয়। ফ্লপি ডিস্কের যুগে এটি বেশি দেখা গেলেও এখনও ইউএসবি ড্রাইভের মাধ্যমে ছড়ায়।

৩. ম্যাক্রো ভাইরাস

মাইক্রোসফট অফিস ডকুমেন্ট (Word, Excel) সংক্রমিত করে। ম্যাক্রো কোড হিসেবে লুকিয়ে থাকে এবং ফাইল ওপেন করলেই সক্রিয় হয়। উদাহরণ: Melissa ভাইরাস

৪. পলিমরফিক ভাইরাস

এটি প্রতিবার সংক্রমণে নিজের কোড পরিবর্তন করে, ফলে অ্যান্টিভাইরাস সনাক্ত করা কঠিন হয়।

৫. রেসিডেন্ট ভাইরাস

মেমোরিতে অবস্থান করে এবং নতুন ফাইল খোলার সময় সেগুলো সংক্রমিত করে।

৬. মাল্টিপার্টাইট ভাইরাস

একাধিক পদ্ধতিতে ছড়ায়, যেমন ফাইল ও বুট সেক্টর একসাথে আক্রমণ করে।

৭. ওভাররাইট ভাইরাস

ফাইলের মূল কন্টেন্ট মুছে দিয়ে নিজেকে প্রতিস্থাপন করে, ফলে ডেটা পুনরুদ্ধার অসম্ভব হয়।

৮. ব্রাউজার হাইজ্যাকার

ব্রাউজার সেটিংস পরিবর্তন করে ব্যবহারকারীকে অবাঞ্ছিত সাইটে রিডাইরেক্ট করে।

৯. র্যানসমওয়্যার

সিস্টেম বা ফাইল লক করে মুক্তিপণ দাবি করে। উদাহরণ: WannaCry

১০. স্পাইওয়্যার

গোপনে ব্যবহারকারীর ডেটা সংগ্রহ করে হ্যাকারদের কাছে পাঠায়।
 

কম্পিউটার ভাইরাস সংক্রমণের লক্ষণ

ভাইরাস আক্রান্ত হলে সাধারণত যেসব লক্ষণ দেখা যায়:

1. অস্বাভাবিক ধীরগতি: ভাইরাস ব্যাকগ্রাউন্ডে রিসোর্স ব্যবহার করলে।

2. ঘন ঘন ক্র্যাশ বা ব্লু স্ক্রিন: সিস্টেমের স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে।
3. অচেনা পপ-আপ বা বিজ্ঞাপন: বিশেষত ব্রাউজারে।
4. ফাইল মুছে যাওয়া বা নাম পরিবর্তন: ভাইরাস ডেটা ক্ষতি করলে।
5. অ্যান্টিভাইরাস নিষ্ক্রিয়: ভাইরাস নিরাপত্তা সফটওয়্যার ব্লক করলে।
6. স্বয়ংক্রিয় ইমেইল পাঠানো: পরিচিতদের কাছে ভাইরাস ছড়াতে।
7. হার্ড ড্রাইভের অত্যধিক এক্টিভিটি: অপ্রত্যাশিত ডেটা ট্রান্সফার।


কম্পিউটার ভাইরাস প্রতিরোধের উপায়

চেতনতাই হলো প্রধান হাতিয়ার। নিচের পদক্ষেপগুলো মেনে চলুন:

১. নির্ভরযোগ্য অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহার

নিয়মিত আপডেট করা অ্যান্টিভাইরাস (যেমন: Norton, Kaspersky) ইনস্টল করুন। রিয়েল-টাইম প্রোটেকশন চালু রাখুন।

২. সফটওয়্যার আপডেট রাখুন

অপারেটিং সিস্টেম ও অ্যাপ্লিকেশনের আপডেটগুলি সিকিউরিটি প্যাচ যোগ করে, তাই দ্রুত ইন্সটল করুন।

৩. সন্দেহজনক লিংক ও অ্যাটাচমেন্ট এড়িয়ে চলুন

অপরিচিত ইমেইল বা ওয়েবসাইট থেকে ফাইল ডাউনলোড করবেন না।

৪. ফায়ারওয়াল সক্রিয় রাখুন

ফায়ারওয়াল নেটওয়ার্ক ট্র্যাফিক মনিটর করে অননুমোদিত অ্যাক্সেস ব্লক করে।

৫. নিয়মিত ডেটা ব্যাকআপ

মহামারির মতো র্যানসমওয়্যার থেকে বাঁচতে গুরুত্বপূর্ণ ডেটা ক্লাউড বা এক্সটার্নাল ড্রাইভে সংরক্ষণ করুন।

৬. শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার

জটিল পাসওয়ার্ড ও টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন (2FA) চালু করুন।

৭. পাইরেটেড সফটওয়্যার পরিহার

ক্র্যাক করা সফটওয়্যারে ম্যালওয়্যার থাকার ঝুঁকি বেশি।


প্রশ্ন ও উত্তর

১. কম্পিউটার ভাইরাস কী?

উত্তরঃ কম্পিউটার ভাইরাস হল একটি ম্যালিশিয়াস প্রোগ্রাম যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং সিস্টেমের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করে। এটি ফাইল নষ্ট করতে, গোপন তথ্য চুরি করতে বা ডিভাইসকে ধীর করে দিতে পারে।

২. কম্পিউটার ভাইরাস কত প্রকারের হতে পারে?

উত্তরঃ কম্পিউটার ভাইরাস বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে, যেমন—

  • ফাইল ইনফেক্টর ভাইরাস (যা ফাইল সংক্রমিত করে)
  • বুট সেক্টর ভাইরাস (বুট সেক্টরে আক্রমণ করে)
  • ম্যাক্রো ভাইরাস (ওয়ার্ড বা এক্সেল ফাইলের মাধ্যমে ছড়ায়)
  • ওয়ার্ম (নিজে নিজেই ছড়ায়)
  • ট্রোজান হর্স (আপাতদৃষ্টিতে নির্দোষ মনে হলেও ক্ষতিকর)

৩. কম্পিউটার ভাইরাসের লক্ষণ কীভাবে বোঝা যায়?

উত্তরঃ কম্পিউটার ভাইরাস সংক্রমণের কিছু সাধারণ লক্ষণ হলো—

  • কম্পিউটার ধীর হয়ে যাওয়া
  • অপ্রত্যাশিত ফাইল ডিলিট বা পরিবর্তন হওয়া
  • অজানা সফটওয়্যার স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইনস্টল হওয়া
  • ইন্টারনেটের ধীর গতি বা অনিয়মিত ব্যবহার
  • হঠাৎ করে পপ-আপ বিজ্ঞাপন দেখা

৪. কম্পিউটার ভাইরাস থেকে নিরাপদ থাকার উপায় কী?

উত্তরঃ কম্পিউটার ভাইরাস প্রতিরোধে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত—

  • বিশ্বস্ত অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার ব্যবহার করা
  • সফটওয়্যার ও অপারেটিং সিস্টেম আপডেট রাখা
  • সন্দেহজনক ইমেইল ও অ্যাটাচমেন্ট খোলা থেকে বিরত থাকা
  • নিরাপদ ও বিশ্বস্ত ওয়েবসাইট ব্রাউজ করা
  • রেগুলার ব্যাকআপ রাখা

৫. কম্পিউটার ভাইরাস কীভাবে সরানো যায়?

উত্তরঃ ভাইরাস সংক্রমিত হলে নিচের পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করা যেতে পারে—

  • সিকিউরিটি স্ক্যান চালানো: অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার দিয়ে পুরো সিস্টেম স্ক্যান করা
  • সন্দেহজনক প্রোগ্রাম আনইনস্টল করা: অজানা বা অনাকাঙ্ক্ষিত সফটওয়্যার মুছে ফেলা
  • সিস্টেম রিস্টোর করা: কম্পিউটারকে আগের সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে আনা
  • বুট-টাইম স্ক্যান চালানো: ভাইরাস অপসারণের জন্য সিস্টেম স্টার্ট হওয়ার আগেই স্ক্যান করা


উপসংহার: সচেতনতাই সুরক্ষার চাবিকাঠি

কম্পিউটার ভাইরাসের হুমকি ডিজিটাল জীবনের একটি বাস্তবতা, তবে সঠিক জ্ঞান ও প্রস্তুতি দিয়ে এটি মোকাবেলা সম্ভব। নিয়মিত সিস্টেম চেকআপ, সফটওয়্যার আপডেট এবং সন্দেহজনক কার্যকলাপ এড়িয়ে চলুন। মনে রাখবেন, আপনার সচেতনতাই পারে ডেটা ও গোপনীয়তা রক্ষা করতে।

আরও পড়ুনঃ 

অটোমেশন কি এবং এটি কীভাবে আমাদের জীবন সহজ করে?

কম্পিউটার সফটওয়্যার কাকে বলে, কত প্রকার ও কি কি


👇আপনি আমাদের তথ্যগুলি আরও যেসব মাধ্যমে পাবেন।👇

👉WhatsApp চ্যানেল ফলো করে রাখুন – এখানে ক্লিক করুন।

👉Telegram চ্যানেল ফলো করে রাখুন – এখানে ক্লিক করুন।

👉Facebook পেজ ফলো করে রাখুন – এখানে ক্লিক করুন।

👉X (twitter) পেজ ফলো করে রাখুন – এখানে ক্লিক করুন।


Next Post Previous Post